ভোলার ৪ প্রভাবশালী এমপি: অবহেলা নাকি ব্যর্থতা? তীব্র গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন
সিহাব চৌধুরী, ভোলা:
সারা দেশে যখন উন্নয়নের ছোঁয়া, তখন দেশের অন্যতম গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী জেলা ভোলাই ভাসছে অন্ধকারের সাগরে। দিন পেরিয়ে রাত, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎহীন থাকছে পুরো জেলা। মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ এলেও তা ৩০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। এই তীব্র গরমে ভোলার সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় ভোট চাইতে নেতারা গ্রামে গ্রামে ঘুরলেও, নির্বাচনের পর তারা হয়ে যান ‘শহরের বাসিন্দা’। ফলে গ্রামীণ জনপদের এই সীমাহীন কষ্ট তাদের চোখে পড়ে না।
৪০০ কোটি টাকার প্রজেক্ট ও কর্মকর্তাদের ‘ভুতুড়ে দুর্নীতি’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভোলায় বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বড় প্রজেক্টের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন লাইন এখনো চালু করা হয়নি। ফলে ভোলার মানুষ এই আধুনিক প্রকল্পের কোনো সুফলই পাচ্ছে না।
সাধারণ জনগণের অভিযোগ, এই প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম দুর্নীতিতে লিপ্ত। বছরের পর বছর তারা শুধু সরকারি বেতন-ভাতা পকেটস্থ করছেন, কিন্তু মূল দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রকাশ্য ব্যর্থতা ও দুর্নীতির পরও তাদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
স্পীকার ও প্রভাবশালী নেতাদের জেলা ভোলার এই দশা কেন?
বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও হেভিওয়েট নেতারা ভোলার সংসদ সদস্য। অথচ তাদেরই নির্বাচনি এলাকার এই বেহাল দশা নিয়ে ক্ষুব্ধ জনগণ। জনগণের অভিযোগ, মূলত শীর্ষ নেতাদের অবহেলার কারণেই ভোলার এই করুণ অবস্থা।
ভোলা-৩ আসন (লালমোহন-তজুমদ্দিন): এই আসনের সংসদ সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, যিনি বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পীকার। এত বড় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পরেও তার এলাকায় বিদ্যুতের এই সংকট সাধারণ মানুষকে হতাশ করেছে।
ভোলা-১ আসন (সদর): এই আসনের এমপি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনের পর ভোলায় সময় না দেওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ ভোলাবাসী। সাধারণ জনগণ মনে করেন, এমপি সাহেব যদি ভোলায় থাকতেন, তবে বিদ্যুৎ বিভাগ এভাবে মনগড়া লোডশেডিং করার সাহস পেত না এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যেত। কিন্তু নেতারা ঢাকায় এসি রুমে থাকায় জনগণের দুর্ভোগ তাদের স্পর্শ করছে না।
ভোলা-২ আসন (বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান): এই আসনের এমপি হাফেজ ইব্রাহিম। বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বা বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তিনিও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি, যা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ব্যতিক্রমী ভূমিকায় ভোলা-৪ আসনের এমপি নয়ন, তবে সমাধান কোথায়?
এদিকে ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সংসদ সদস্য ও যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন-কে নিয়ে এলাকায় ভিন্ন আলোচনা রয়েছে। তারেক রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন এই তরুণ নেতা পুরো দেশের যুবদলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। দল-মত নির্বিশেষে চরফ্যাশনের মানুষ তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে।
স্থানীয়দের দাবি, নুরুল ইসলাম নয়ন চেষ্টা করলে এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ভোলার ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। দেশজুড়ে রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে তাকে বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকতে হলেও, গত ঈদুল আযহায় চরফ্যাশনে এসে তিনি বিদ্যুতের এই সংকট নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা করেছেন এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। ইতিমধ্যে তার বিশেষ উদ্যোগে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরাকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে পুরো ভোলার বিদ্যুৎ নিয়ে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের এই চরম গরিমসি ও অবহেলার প্রতিকার কোথায়, তা এখনো অজানা।
অবহেলা নাকি ব্যর্থতা?
ভোলার সচেতন সমাজ ও সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই বড় কৌতুহল ও প্রশ্ন— দেশের এত বড় বড় ৪ জন প্রভাবশালী নেতা একই জেলার এমপি থাকার পরও কেন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অন্ধকারে থাকবে? এটি কি এমপিদের সদিচ্ছার অভাব ও অবহেলা, নাকি বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতির কাছে তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা?
ভোলার সাধারণ মানুষ এখন আর কোনো আশ্বাস বা বাহানা শুনতে চায় না। তারা চায় দ্রুত ৪০০ কোটি টাকার প্রজেক্টটি চালু করে ভোলার ঘরে ঘরে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হোক।
৪ প্রভাবশালী নেতা বনাম ভোলার অন্ধকার জনজীবন!অবহেলা নাকি ব্যর্থতা?





