সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়াকে নিয়ে বিচার অঙ্গনে এবং আইনজীবী মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত একটি মামলার বিচারিক কার্যক্রমে চরম অনিয়ম, নজিরবিহীন দ্রুতগতি এবং জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর আপিল বিভাগের তলবের মুখে পড়েন তিনি।
নিচে এই চাঞ্চল্যকর মামলার সম্পূর্ণ ইতিহাস ও নেপথ্যের ঘটনা তুলে ধরা হলো:
১. মামলার মূল পটভূমি ও প্রাথমিক রায় (রিট মামলা নং- ৯১৯/২০২০)
মূল ইস্যু: নারী কোটা (৬০ শতাংশ) যথাযথভাবে না মেনে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে—এই অভিযোগে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা (৯১৯/২০২০) দায়ের করা হয়।
হাইকোর্টের প্রাথমিক রায়: রিটের প্রাথমিক শুনানি ও কার্যক্রমে আদালত নারী কোটা যথাযথভাবে না মানার অভিযোগের সত্যতা পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি নির্দিষ্ট নিয়োগের চূড়ান্ত ফল বাতিল ঘোষণা করে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে নতুন মেধাতালিকা তৈরির নির্দেশ প্রদান করে।
২. মামলার আবেদনকারী পরিবর্তন ও নজিরবিহীন অনিয়ম
রাষ্ট্রপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মামলায় পরবর্তীতে গুরুতর কিছু অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়:
আবেদনকারী পরিবর্তন: যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং মূল রেসপন্ডেন্টদের (যাঁরা চাকরি পেয়েছিলেন) কোনো ধরনের নোটিশ না দিয়েই মামলার মূল ৫৮ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে ৪০ জনকে বাদ দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে তড়িঘড়ি করে নতুন ৬৪ জনকে যুক্ত করা হয়।
পদ্ধতিগত ত্রুটি: মামলাটির ফাইল সংশ্লিষ্ট শাখায় (সেকশনে) না পাঠিয়ে এবং স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতি লঙ্ঘন করা হয়। এছাড়া বাদ পড়াদের পক্ষে স্বাক্ষরকারীর আইনি বৈধতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের জবাব দেওয়ার সুযোগ ছিল কি না—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
৩. বিচারকাজের অস্বাভাবিক দ্রুতগতি
মামলাটির শুনানির ক্ষেত্রে যে গতি দেখানো হয়েছে, তা বিচারিক ইতিহাসে বিরল:
নিয়মিত সেকশন-প্রক্রিয়া বা নিয়মনীতি সম্পূর্ণ এড়িয়ে মাত্র এক দিনেই আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
শুনানি শেষে মাত্র চার দিনের মাথায় নতুন আবেদনকারীদের পক্ষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়।
আদালতের কার্যতালিকা বা কার্যদিবসের রেকর্ডে দেখা যায়, একই দিনে মামলার দরখাস্ত কলাম এবং শুনানি কলাম—উভয়ত্রই মামলাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই দিনই দরখাস্ত মঞ্জুর করে আংশিক শুনানি গ্রহণ করা হয় এবং ঠিক পরের দিনই শুনানি শেষ করা হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, নির্ধারিত রায় বা জাজমেন্ট ঘোষণার ঠিক একদিন আগে সম্পূর্ণ পৃথক আরেকটি দরখাস্ত শুনানি ও মঞ্জুর করা হয়।
৪. আপিল বিভাগের ক্ষোভ ও আইনজীবীকে তলব
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে। আপিল বিভাগের নজরে মামলার নথিপত্র আসার পর বিচার প্রক্রিয়ার এই নজিরবিহীন দ্রুতগতি এবং নিয়মের ব্যত্যয় দেখে আদালত চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়াকে তলব করে আপিল বিভাগ।
৫. অন্তত ৯টি মামলায় একই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত কেবল এই একটি মামলাই নয়, বরং আরও বড় জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত অন্তত ৯টি মামলায় ঠিক একই কায়দায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভুঁইফোঁড় বা নতুন পক্ষ যুক্ত করে রায় করিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার এমন ঘটনা পুরো আইঙ্গনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
৬. আইনজীবীর নিজস্ব অবস্থান ও সাফাই
সারows বিষয় নিয়ে তুমুল আলোচনার মুখে আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া তাঁর সাফাইয়ে দাবি করেছেন যে, তিনি নিয়মতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়াই অনুসরণ করেছেন। তিনি গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্টদের জানান যে, এ ক্ষেত্রে ফাইলপত্র ও সেকশন সংক্রান্ত কিছু জটিলতা বা লজিস্টিক্যাল সমস্যা ছিল।
৪০ জন বাদ, নতুন ৬৪ জন যুক্ত,প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে সিদ্দিক উল্লাহ মিয়ার ভয়াবহ প্রতারণা






